কিরগিজস্তানে অধ্যায়নরত শত শত বাংলাদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে কিরগিজ সরকার বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ রাখায় দেশে এসে আটকে পড়া পুরনো শিক্ষার্থীরা আর ফিরতে পারছেন না। কিরগিজস্তানেও অনেক শিক্ষার্থী আছেন যাদের ভিসা জটিলতায় আছেন।কিরগিজ ই-ভিসা পোর্টালে আবেদনের সুযোগ থাকলেও রহস্যজনক কারণে প্রায় প্রতিটি আবেদনই প্রত্যাখ্যান (রিজেক্ট) করা হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা একটি ‘অঘোষিত বা অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞা’ হিসেবে দেখছেন।
কিরগিজ ভিসা পোর্টালে সবুজ সংকেত, বাস্তবে লাল সংকেত:
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কির্গিজস্তানের অফিশিয়াল ই-ভিসা পোর্টালে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও এবং আবেদন প্রক্রিয়া সচল দেখালেও, আবেদনের কয়েকদিন পরেই কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই তা বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যারা পঞ্চম বা তার ওপরের সেমিস্টারে পড়ছেন, যারা ইতোমধ্যে কয়েক বছর সেখানে কাটিয়ে এসেছেন এবং লক্ষ লক্ষ টাকা টিউশন ফি জমা দিয়েছেন, তারাও এখন দেশটিতে ফিরতে পারছেন না।
কী কারণে এই সংকট?
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কিরগিজস্তান প্রায় ১৮০ জন অনিবন্ধিত বাংলাদেশি নাগরিককে বিতাড়িত করে, যাঁরা প্রতারণামূলক পথে দেশটিতে প্রবেশ করেছিলেন এবংকিছু বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে ভুয়া ভিসা চক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিরগিজ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রতি সামগ্রিকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈধ ও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের উপরও, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে সেখানে পড়াশোনা করছেন। এছাড়া গত ডিসেম্বর (২০২৫) থেকে কির্গিজস্তান নতুন অভিবাসন নীতি কার্যকর করেছে, যার ফলে সব দেশের জন্যই স্টুডেন্ট ভিসা (S-Type) ইস্যু করার হার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশিদের ভিসা ইস্যু করার হার প্রায় ৫৮% হ্রাস পেয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আর্তনাদঃ
মোস্তফা আবিদ বলেন, আমি লাস্ট (১০ম) সেমিস্টারের আভিসিনা মেডিকেল ইউনিভার্সিটি এর একজন ছাত্র। কিরগিজ রিপাবলিকের একজন বৈধ ছাত্র, ভিসাজনিত সমস্যার কারণে গত দশ মাস ধরে বাংলাদেশে আটকে আছি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি ৯ম সেমিস্টারের একজন ছাত্র। কিরগিজ রিপাবলিকের একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটির বৈধ ছাত্র, ভিসাজনিত সমস্যার কারণে প্রায় নয়-দশ মাস ধরে বাংলাদেশে আটকে আছি।
আমি রাহাতুন্নেছা জিম, আমার বোন রাইসা খাতুন মিম, আমরা ষষ্ঠ সেমিস্টারের কিরগিজ রিপাবলিকের ইন্টারন্যাশনাল ইউরোপীয়ান ইউনিভার্সিটির বৈধ ছাত্রী। আমরা ইন্টারনাল মাইগ্রেশন নেওয়ার কারণে আমার নতুন ইনভাইটেশন ভিসা প্রয়োজন। কিন্তু নতুন ইনভাইটেশন ভিসা পাচ্ছিনা।
মাহিম সুলতানা লিয়া বলেন, ষষ্ঠ সেমিস্টারের কিরগিজ রিপাবলিকের একজন বৈধ ছাত্রী। আমি ইন্টারনাল মাইগ্রেশন নিয়েছি কিরগিজ স্টেট মেডিকেল কলেজ থেকে। আমার নতুন ইনভাইটেশন ভিসা প্রয়োজন তবে নতুন ভিসা পাচ্ছিনা।
আব্দুস সাত্তার বলেন, আমি একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে আমি আমার পরিবারের সকল দায়িত্ব ও স্বাচ্ছন্দ্য পিছনে ফেলে বিদেশে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে কিরগিজস্তানে ডাক্তার হবার স্বপ্ন নিয়ে যাই। আমি কিরগিজসবিশ্ববিদ্যালয়ে ষষ্ঠ সেমিস্টারের একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী। আমি গত জুন মাসে বাংলাদেশে এসে ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা কারণ দেশে আটকা পড়ছি। কিন্তু এই অঘোষিত কৃত্রিম ভিসা জটিলতায় কারণে আমার পড়াশোনা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির ফলে আমি এবং আমার পরিবার মানসিক ও আর্থিকভাবে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি। পরিবারের সকলেই আমার এই শিক্ষাজীবনের উপর অনেক আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে আছেন। আমার শিক্ষাজীবন দীর্ঘদিন স্থগিত থাকায় আমি এবং আমার পরিবার উভয়েই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আমার উচ্চশিক্ষাই আমাদের পরিবারের ভবিষ্যতের প্রধান আশার জায়গা। এই অনিশ্চয়তা আমাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে এবং আর্থিক দিক থেকেও আমরা চরম চাপে আছি।
একজন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, যিনি বর্তমানে ৫ম সেমিস্টারে পড়ছেন, তিনি জানান: “আমি ছুটিতে দেশে এসেছিলাম, কিন্তু এখন ভিসা না পাওয়ায় আমার শিক্ষা জীবন ধ্বংসের পথে। আমাদের অনেক টাকা অলরেডি খরচ হয়ে গেছে। ই-ভিসা পোর্টালে সব ঠিক দেখায়, কিন্তু আবেদন করলেই রিজেক্ট হয়। কিরগিজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো কারণ দর্শাচ্ছে না। আমরা কি আর আমাদের পড়াশোনা শেষ করতে পারব না?”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, তিনি বলেন, আমি একজন ৮ম সেমিস্টারের নিয়মিত ছাত্র। আমি সহ অনেক বন্ধু-বান্ধব আছে যারা কিরগিজস্তানে অবস্থান করছে কিন্তু ভিসা জটিলতা থাকায় বৈধ ছাত্র হওয়ার পরেও অবৈধ অভিবাসী হিসেবে রয়ে গেছেন। বাংলাদেশে অনেক ছাত্র-ছাত্রী আটকা পড়ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আমাদের শিক্ষা জীবন হুমকির মুখে পড়বে।
একইভাবে আরও অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাকায় কিরগিজ দূতাবাসের অনুপস্থিতিতে এবং দিল্লির দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা
শিক্ষার্থীরা বলছেন, এটি এখন আর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং একটি জাতীয় ও কূটনৈতিক সমস্যা। তারা বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন যেন অনতিবিলম্বে কিরগিজ সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করা হয়। বিশেষ করে যারা ‘কন্টিনিউয়িং স্টুডেন্ট’ বা পুরনো শিক্ষার্থী, তাদের জন্য বিশেষ ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা করতে সরকারের জোরালো পদক্ষেপ জরুরি।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপই এখন একমাত্র সমাধান বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং কয়েক বছরের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে কয়েক শ’ ভবিষ্যৎ চিকিৎসকের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে।
এমএসএফ । বিশকেক
এই রংপুর নিউজ ৭১ পোর্টালে নিজস্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল, টিভি চ্যানেলের পোর্টাল থেকে খবর/নিউজ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে যদি আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ পোর্টাল বা টিভি চ্যানেলের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে রংপুর নিউজ ৭১ এর সংবাদ/প্রতিবেদন, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।




